মানুষের জন্ম নেয়ার স্বার্থকতা কোথায়

প্রশ্নটি মানুষের মতোই প্রাচীন। যেদিন প্রথম কোনো মানুষ প্রিয়জনের নিথর দেহের পাশে বসে আকাশের দিকে তাকিয়েছিল, সেদিনই হয়তো এই প্রশ্নের জন্ম। মৃত্যু যদি অনিবার্য হয়, তবে জন্মের মানে কী? কোটি কোটি মানুষ আসছে, কিছুকাল হাসছে, কাঁদছে, ঘর বাঁধছে, তারপর একদিন মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এই আসা-যাওয়ার মিছিলে একজন মানুষের অস্তিত্বের ভার কতটুকু?

প্রথমে বিজ্ঞানের দরজায় কড়া নাড়া যাক। জীববিজ্ঞান এই প্রশ্নের “কেন”-র উত্তর দেয় না, দেয় “কীভাবে”-র উত্তর। প্রায় চারশো কোটি বছর আগে পৃথিবীর আদিম জলাশয়ে এমন কিছু অণুর উদ্ভব ঘটেছিল যারা নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করতে পারত। সেই থেকে প্রাণ নিজেকে টিকিয়ে রাখার এক অবিরাম প্রবাহে বয়ে চলেছে। মানুষ সেই প্রবাহেরই একটি ঢেউ। বিজ্ঞানের চোখে জন্মের কোনো পূর্বনির্ধারিত উদ্দেশ্য নেই; আছে কেবল ধারাবাহিকতা। মা-বাবার কোষ থেকে সন্তানের কোষ, সন্তানের কোষ থেকে তার সন্তানের। ব্যক্তি মরে যায়, কিন্তু জীবনের সুতো ছিঁড়ে যায় না। এই উত্তর সৎ, কিন্তু অনেকের কাছে শীতল। কারণ মানুষ কেবল টিকে থাকতে চায় না, সে জানতে চায় কেন টিকে আছে।

এই শূন্যতা পূরণ করতে এগিয়ে এসেছে ধর্ম। প্রায় প্রতিটি ধর্মই বলে, মানুষের জন্ম আকস্মিক নয়, এর পেছনে এক মহৎ অভিপ্রায় আছে। কুরআনে বলা হয়েছে, জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে ইবাদতের জন্য, এবং জীবন ও মৃত্যু একটি পরীক্ষা, কে কর্মে উত্তম তা যাচাই করার জন্য। খ্রিস্টীয় বিশ্বাসে মানুষ ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিতে গড়া, তার লক্ষ্য স্রষ্টার সঙ্গে মিলন। হিন্দু দর্শনে জন্ম কর্মফলের চক্রের অংশ, আর মুক্তি সেই চক্র থেকে বেরিয়ে আসায়। বৌদ্ধ ভাবনা আরও এক ধাপ এগিয়ে বলে, জন্ম নিজেই দুঃখের উৎস, আর নির্বাণ হলো পুনর্জন্মের অবসান। লক্ষণীয় যে এসব বিশ্বাসে মৃত্যু জন্মকে অর্থহীন করে না, বরং মৃত্যুর পরের পর্বই জন্মকে অর্থ দেয়। যাঁরা এই বিশ্বাস ধারণ করেন, তাঁদের কাছে প্রশ্নটির উত্তর ইতোমধ্যে দেওয়া আছে।

কিন্তু যাঁরা সেই উত্তরে স্থির হতে পারেননি, তাঁদের জন্য দর্শন আরেকটি পথ খুলেছে। বিশ শতকের অস্তিত্ববাদী চিন্তকেরা বললেন, মানুষ আগে জন্মায়, তারপর নিজের অর্থ নিজেই তৈরি করে। জ্যাঁ-পল সার্ত্রের ভাষায়, অস্তিত্ব সারসত্তার আগে আসে। অর্থাৎ কোনো ছাঁচে ঢেলে মানুষকে পাঠানো হয়নি; সে নিজের কাজ, নিজের পছন্দ আর নিজের দায় দিয়ে নিজেকে গড়ে তোলে। আলবেয়ার কামু আরও সাহসী এক চিত্র আঁকলেন। গ্রিক পুরাণের সিসিফাস অনন্তকাল ধরে পাথর ঠেলে পাহাড়ে তোলে, আর পাথর গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়। আপাতদৃষ্টিতে এর চেয়ে অর্থহীন শ্রম আর হয় না। তবু কামু লিখলেন, সিসিফাসকে সুখী বলেই কল্পনা করতে হবে। কারণ অর্থ পাথরের চূড়ায় পৌঁছানোয় নয়, ঠেলে চলার মধ্যেই।

বাংলার মাটিও এই প্রশ্ন থেকে দূরে থাকেনি। লালন ফকির দেহের খাঁচায় বন্দি এক অচিন পাখির কথা গেয়েছেন, যে কখন আসে কখন যায় কেউ জানে না। সেই পাখিকে চেনার আকুতিই তাঁর কাছে জীবনের সাধনা। আর রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর অনিবার্যতা জেনেও লিখেছিলেন, “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।” এই পঙ্‌ক্তিতে জন্মের সার্থকতা খোঁজা হয়েছে অন্য মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকার মধ্যে।

এখানেই হয়তো প্রশ্নটির সবচেয়ে মানবিক উত্তর লুকিয়ে আছে। মৃত্যু অনিবার্য বলেই জীবন মূল্যবান। যে জিনিস অফুরন্ত, তার কদর থাকে না। একটি সূর্যাস্ত সুন্দর কারণ তা কয়েক মিনিটেই মিলিয়ে যায়। মানুষের জীবনও তেমনি। সীমাবদ্ধ সময় তাকে বাধ্য করে বেছে নিতে, ভালোবাসতে, কিছু রেখে যেতে। একজন শিক্ষক যে ছাত্রকে গড়ে দেন, একজন কৃষক যে ফসল ফলান, একজন লেখক যে বই রেখে যান, একজন মা যে সন্তানকে মানুষ করেন, তাঁরা সবাই মৃত্যুর পরেও অন্যের জীবনে প্রবাহিত হতে থাকেন। কোটি মানুষের ভিড়ে একজনের অস্তিত্ব ক্ষুদ্র মনে হতে পারে, কিন্তু সভ্যতা নামের বিশাল ইমারত এই ক্ষুদ্র ইটগুলো দিয়েই তৈরি।

তাই হয়তো প্রশ্নটি এভাবে ঘুরিয়ে দেখা যায়। মানুষ কেন জন্ম নেয়, তার চূড়ান্ত উত্তর বিশ্বাসী খুঁজে পান ধর্মে, বিজ্ঞানী খুঁজে পান প্রাণের ধারাবাহিকতায়, দার্শনিক খুঁজে পান নিজের নির্মাণে। কিন্তু জন্মের সার্থকতা কোথায়, সেই প্রশ্নের উত্তর কোনো গ্রন্থে লেখা থাকে না; তা লেখা হয় প্রতিটি মানুষের নিজের জীবনে, প্রতিদিনের কাজে, সম্পর্কে আর রেখে যাওয়া চিহ্নে। জন্ম আমাদের হাতে ছিল না, মৃত্যুও নয়। মাঝখানের সময়টুকুই কেবল আমাদের। আর সেই সময়কে কী দিয়ে ভরিয়ে তুলব, সেটিই হয়তো জন্মের প্রকৃত অর্থ।


Welcome to WordPress! This is your first post. Edit or delete it to take the first step in your blogging journey.

Leave a Reply